“স্থাপত্যের রাজা মিমার সিনান”

0
143
Good work
Image- মিমার সিনান

“স্থাপত্যের রাজা মিমার সিনান”
——————————————————————————–

গতকাল 0৯-০৪-২০২০ তারিখ ছিল মিমার সিনান এর ৪৩২ তম মৃত্যুবার্ষিকী। পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যবিদদের একজন মিমার সিনান, তুরস্কের কায়সারি শহরের আয়িরনাস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসে তাঁর সঠিক জন্মতারিখ সম্পর্কে জানা যায় নি, তবে ১৪৯১ সালে জন্মগ্রহণ করেন বলে ধারণা করা হয়।
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে তাঁকে ইয়েনিচেরি গ্রুপে নেওয়া হয়। ইয়েনিচেরি গ্রুপ হলো ওসমানী খেলাফতের সামরিক গ্রুপ। মূলত খলিফা অভিজানে গেলে তাঁকে বেষ্টনী করে পাহারা দেওয়া সামরিক গ্রুপ তারাই। ইয়েনিচেরিতে থাকাকালে তিনি বিভিন্ন অভিজানে অংশ নেন এবং নিজ প্ল্যান ও স্থাপত্য কৌশলের মাধ্যমে অতি দ্রুত খলিফার নিকট নিজ প্রতিভা প্রকাশ করতে সক্ষম হন। ইয়াভুজ সুলতান সেলিমের রাজত্বকালে সুলতানের আমন্ত্রণে ইস্তাম্বুলে বসবাস শুরু করেন।

কানুনী সুলতান সুলাইমানের শাসনামলে সিনান, কারা বুউদান অভিজানের সময় মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে প্রুট নদীর উপরে সেতু নির্মাণ করে সুলতান সুলাইমানের প্রশংসা অর্জন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সুলতানের প্রধান স্থপতি হিসাবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন।

মূলত গভীর চিন্তা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে নিখুঁত স্থাপত্যের নিদর্শনই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। জীবনকালে প্রায় ৩৬৫ টি স্থাপত্যশিল্পে নিজ সাক্ষর রেখেছেন। এছাড়াও ওসমানী খেলাফতের ভিতরে অবস্থিত বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপত্য পুনরুদ্ধার করে সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী করে তোলেন।

মিমার সিনান, যিনি তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওসমানী খেলাফতের রেইস-ই মিমারান(প্রধান স্থাপত্যবিদ) হিসাবে দায়িত্বরত ছিলেন, তিনটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে নিজ পেশায় উদাহরণ রেখে গিয়েছিলেন। অপেশাদার পর্যায়ের উদাহরণ হিসাবে ইস্তানবুলের শাহজাদা মসজিদ, সেমি-প্রফেশনাল পর্যায়ের শিল্প হিসেবে ইস্তানবুলের সুলেইমানিয়া মসজিদ এবং প্রফেশনাল হিসেবে ওসমানী খেলাফতের সাবেক রাজধানী এদিরনে শহরের সেলিমিয়া মসজিদকে উদাহরণ হিসেবে রেখে গিয়েছেন। ৯২ টি মসজিদ, ৫২ টি নামাজ ঘর, ৫৫ টি মাদ্রাসা, ২০ টি সমাধি, ১৭টি বিল্ডিং, ৬ টি নৌপথ, ১০ টি সেতু, ২০ টি হোটেল, ৩৬ টি প্রাসাদ, ৮ টি গুদামঘর এবং ৪৮ টি হামামসহ মোট ৩৬৫ টি কাজের মাধ্যমে নিজ যোগ্যতাকে অমর করে রেখেছেন। তাঁর ইস্তাম্বুল ও তার আশেপাশে মিলিয়ে প্রায় ২০০ টির মত স্থাপত্য যার ১০০ টি শুধুমাত্র ইস্তাম্বুলেই রয়েছে।

ইস্তাম্বুলের ১০০ টির মধ্যে ৫৮ টি এখনো প্রথম দিনের মতই অটুট রয়েছে, ইস্তানবুলে তাঁর স্থাপত্যসমূহের মধ্যে বেসিকতাশে অবস্থিত প্রখ্যাত সমুদ্র পরিব্রাজক হায়রেদ্দিন পাশা বারবারোসের সমাধিস্থল, উসকুদার আতিক ওয়ালিদে সুলতান কমপ্লেক্স, সুলতানহামিদ স্কোয়ারের ইব্রাহিম পাশা প্রাসাদ এবং আয়া সোফিয়া মসজিদটির মিনারগুলি অন্যতম।

অপেশাদার, সেমি-প্রফেশনাল এবং প্রফেশনাল মাস্টারপিস

মিমার সিনান ১৫৪২-১৫৪৮ সালের ভেতর নির্মিত শাহজাদে মসজিদে অর্ধ গম্বুজের ধারণাটি প্রথমবারের মতো তুলে ধরেন যাকে তাঁর কর্মের অপেশাদার পর্যায়ের অংশ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। সিনান, মসজিদের গম্বুজে এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন যাতে মধ্যখানে একটি বৃহৎ গোলার্ধ আকৃতির গম্বুজ এবং চাড়পাশে চারটি অর্ধ গম্বুজ স্থান পেয়েছে।

সুলায়মানিয়ে মসজিদের ২৭.৫ মিটারের বৃহত গম্বুজটি তাঁর স্থাপত্য কারুকার্যের সেমি-প্রফেশনাল পর্যায়ের একটি উদাহরণ, যেটি আয়া সোফিয়ার মতো মসজিদের ঠিক মাঝখানে একটি অর্ধ গম্বুজ দ্বারা তাঁর গঠনকে শক্তিশালী করেছে। মসজিদের চার কোণে অবস্থিত ভিন্ন আকারের ৪টি মিনার রয়েছে যার ২ টি উচ্চতায় ৫৬ মিটার করে এবং অপর ২ টি উচ্চতায় ৭৬ মিটার করে নির্মিত হয়েছে।
মিমার সিনানের হিসাব অনুসারে মসজিদে সূর্যের পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থার জন্য মসজিদের মূল গম্বুজে ৩২ টি জানালা রয়েছে।

মসজিদ ভিতরে মোট ২৮ টি অংশ রয়েছে এবং এর ঠিক মাঝখানে একটি ঝর্ণা রয়েছে, যা আয়তক্ষেত্রাকার অংশের উপর নির্মিত। কানুনি সুলতান সুলেইলেমান এবং তাঁর স্ত্রী হুররেম সুলতানের সমাধিও সুলেইমানিয়া মসজিদের বাইরের উঠানে অবস্থিত।

ঐতিহাসিকগণ তাঁর যুগকে “সিনানীয় যুগ” বলে আখ্যায়িত রয়েছে।

এদিরনের সেলিমিয়ে মসজিদ, যা তাঁর অন্যতম প্রফেশনাল হিসেবে পরিচিত, তুর্কি-অটোমান শিল্প ও বিশ্ব স্থাপত্য ইতিহাসের অন্যতম প্রধান স্থাপত্য হিসাবে গৃহীত হয়েছে। এই মসজিদটিও চারটি মিনার দিয়ে দাঁড়ানো এবং সুলতান সেলিমের সময়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদ প্রতিষ্ঠানের স্থান বেছে নেওয়া থেকে শুরু করে স্থাপত্য কারুকার্য তাঁকে একজন বিশেষজ্ঞ প্ল্যানার হিসেবে প্রমাণ করেছে।

কাটা পাথর দ্বারা নির্মিত মসজিদটির এবং সেই সাথে প্রাঙ্গণ সহ মোট আয়তন ২৭৪৫ বর্গ মিটার, যার অভ্যন্তরীণ অংশই শুধুমাত্র ১৬২০ বর্গমিটার । মাটি থেকে ৪৩.২৮ মিটার উপরে অবস্থিত ৩১.৩০ মিটার ব্যাসের গম্বুজটি সর্বদাই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

মিমার সিনান, যিনি তাঁর স্থাপত্যশিল্পের মাধ্যমে নিজ সময়কে ইতিহাসে “সিনানীয় যুগ” হিসেবে পরিচিত করেছিলেন, ১৫৮৮ সালের ৯ এপ্রিল ৯৮ বছর বয়সে ইস্তাম্বুলে ইন্তিকাল করেন।

বিঃ দ্রঃ উইকিপেডিয়াতে উনার ওফাত(মৃত্যু) ১৭ জুলাই দেখালেও, তুর্কিশ সোর্স অনুযায়ী উনার সঠিক ওফাত তারিখ ৯ এপ্রিল।

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here