“নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আমাদের করণীয়”

0
126

“নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আমাদের করণীয়”

আমরা এক কঠিন সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যদিয়ে সময় অতিবাহিত করছি, সম্প্রতিকালের একটি সংকট বাহ্যিকভাবে আমাদের দৃষ্টিগত হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী চলমান সংকটগুলি ইদানীংকালে শুরু হওয়া কোন সংকট নয়!
মূলত গত তিনশো বছর যাবত বিশ্ব মানবতা ভয়াবহ এই সংকটাপন্ন অবস্থা পাড়ি দিচ্ছে। এই সংকট স্থায়ী সংকট, তাই সাময়িকভাবে এর সমাধান করা অসম্ভব ব্যাপার। সুতরাং স্থায়ী সমস্যা সমূহের স্থায়ী সমাধান-ই আমাদের জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য।

বিশ্ব মানবতার এই অবস্থায় উপনীত হবার সময়কালকে যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি। বিশ্ব ক্ষমতায় নতুন করে আসীন হওয়া পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থানের পর্যায় গুলিকে আমরা যদি বিশ্লেষণ করি।
তাহলে দেখতে পাই,
• আড়াইশো বছর আগেও দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞান ছিল ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রিক। প্লেটো, এরিস্টটলদের লেখনীসমূহও পর্যন্ত মুসলিমরা অনুবাদ করে সংরক্ষণ করেছে, চর্চা করেছে। সেখান থেকেই পরবর্তীতে ইউরোপ সংগ্রহ করেছে।
প্রকৃতি বিজ্ঞান(গণিত, পদার্থ,জোতির্বিদ্যা, মেডিসিন ইত্যাদি), সমাজ, রাষ্ট্রসহ সকল জ্ঞানের উৎস ছিল মুসলিমরা, পরিভাষাগুলো পর্যন্ত ছিল মুসলমানদের।
• সকল ইতিহাস চর্চাও ছিল ইসলাম কেন্দ্রিক।যেমন ইউরোপের লিখিত ৬২ খন্ডের ইউনিভার্সাল হিস্ট্রি লিখা হয় (ফরাসিতে যা অনুবাদ হয় ১২২ খণ্ডে) যার মূল সোর্সগুলি ছিল আরবি কেন্দ্রিক, যেমন তাফসীরে তাবারী থেকে অনুদিত। যাই হোক এই ৬২ খন্ডের ৩০খন্ড ছিল ইসলামের ইতিহাস, অর্থাৎ ইসলামী সভ্যতা ব্যাতীত ইতিহাস রচনাও অসম্ভব ছিল।
কিন্তু লক্ষ্য করুন, এতগুলি খন্ড লিখিত থাকা, সেখান থেকে শিক্ষা অর্জন করার পরেও তারা বলল আমাদের কি তাহলে মুসলমানদের উপর কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত? তারাই আবার জবাব দিচ্ছে, একটা জাতি আরেকটা জাতির থেকে উপকৃত হতেই পারে, তাতে কৃতজ্ঞতা দেখানোর কিছুই নেই!
অথচ মুসলিমরা পুরোপুরিভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, তা সত্যেও পূর্বপুরুষদের কথা, অন্যান্য সভ্যতার কথা উল্লেখ করত, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করত। আল কিন্দিরাই এর সবথেকে বড় দৃষ্টান্ত।

এভাবে অন্যান্য ইতিহাস বা সকল ঐতিহাসিকরা-ই পৃথিবীর ইতিহাস শুরু করত আদম(আ) থেকে। বানর বা ডারউইন-ই ইতিহাস তথা সেক্যুলার ইতিহাসের ধারা তো শুরু হলো সেদিন মাত্র। বাস্তবতা হল, একটা সময় পর্যন্ত তো বই-ই ছিলনা, মুসলিমরা আব্বাসীয় শাসনামলে আজকের এই বই পদ্ধতিকে আবিষ্কার করে (তার আগে শীট বা বিভিন্ন ভাবে সংরক্ষণ হতো)। উস্তাদ তথা জীবন্ত গ্রন্থ থেকেই জ্ঞান চর্চা ছিল, এরই সাথে মুসলিমরা স্থিরগ্রন্থ যুক্ত করলো, এবং ইতিহাস লেখার পদ্ধতিকে একটি বিজ্ঞানে পরিণত করলো (যেমন, ইবনে খালদুনের আল মুকাদ্দিমা)।

এভাবেই জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস ছিল ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রিক, যার ফলে পাশ্চাত্যের সব প্রতিষ্ঠানেই আরবি ছিল। আরবি কেন্দ্রিক-ই ছিল সমস্ত জ্ঞান আর আরবি ছাড়া তো অন্য ভাষায় তেমন জ্ঞানই ছিলই না।

মূলত এক্ষেত্রে বিশাল পরিবর্তনটিই মানবতার ইতিহাসে সবথেকে বড় সংকটের সৃষ্টি করে! তা হচ্ছে, ১৮শ শতকের পরে এসে পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকরা ইতিহাসের ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রিকতা কে সরিয়ে ফেলে! নতুনভাবে তৈরি করে তিনটি পরিভাষা_
♦ প্রাচীন যুগ (গ্রিক, রোমান)।
♦ মধ্যযুগ।
♦ আধুনিক যুগ।
তারা মূলত মধ্যযুগের মধ্যেই ইসলামী সভ্যতাকে গোপন করে অন্ধকার যুগ বলে আখ্যায়িত করা পাশাপাশি পুরোপুরিভাবে সভ্যতার অবদানকে অস্বীকার করতে শুরু করে, সে আলোকেই ইতিহাস লিখতে শুরু করে। আবার পাশ্চাত্যের উত্থান কালকে আধুনিক যুগ বলে একটি নতুন আলোর বা নব্য রেনেসাঁর সূচনাকাল হিসেবেই সামনে তুলে ধরে! সে আলোকেই গড়ে উঠেছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের ইতিহাস শিক্ষা ও আমাদের সকল দৃষ্টিভঙ্গি! এরথেকে ভয়াবহ জুলুম আর কি হতে পারে?
• সমাজব্যবস্থা ছিল ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রিক, সে ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ যথেষ্ট। যেমন, জার্মান কবি গ্যোটে (১৭৪৯ – ১৮৩২), তিনি শ্রেষ্ঠ মানব মোহাম্মদ (সা) কে নিয়ে কবিতা লেখেন, তখন তার বয়স ২৩ বছর। কবিতার একটু ভাবার্থ এমন_
“একটু পানি..
সেই পানি এমন তারকা’র মত, যেদিকেই গিয়েছে জমিনকে উর্বর করেছে, পরিবেশকে সবুজ করেছে।
ইহা এমনই পানি, যা পাহাড় থেকে পড়া ঝরনার মত যেদিকেই গিয়েছে রং ছড়িয়েছে, সবাইকে কাছে টেনে নিয়েছে।
এমন পানি, যেদিকেই গিয়েছে পুষ্পে পুষ্পে সুশোভিত করেছে, সব অন্ধকারাচ্ছন্ন গর্তকে পরিপূর্ণ করেছে রুপার আলো দিয়ে, প্রতিষ্ঠা করেছে বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব।”

প্রখ্যাত দার্শনিক তাহসিন গুরগুণ বলেন, কেউ যদি কবিতার মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাস পড়তে চায় তাহলে এই কবিতাটি পড়লেই যথেষ্ট।
আচ্ছা এখন প্রশ্ন হল, কোরআনের আয়াতের আলোকে এত কম বয়সে এমন কবিতা লিখা কি করে সম্ভব?
দুইভাবে সম্ভব
১, রাসুল(সা) এর সবকিছুকে স্বপ্নে দেখা। অথবা
২, তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা ও শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্রিক।
অতএব স্পষ্টভাবেই বুঝা যায় তৎকালীন বিশ্বব্যাপী সমাজ ব্যবস্থা কোন কেন্দ্রিক ছিল..।

_
সে আলোকে পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থানের পর্যায় গুলোর দিকে যদি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব তিনটি ধাপের মধ্য দিয়ে তাদের এই ক্ষমতায়ন সম্পূর্ণ হয়েছে।
১, ইসলামী সভ্যতায় বা মুসলমানদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ।

২, নিজেরা শক্তিশালী হওয়া এবং ইসলামকে কিভাবে মানুষ, মুসলমানরা বুঝবে সেই জ্ঞান ভান্ডার তৈরি করা(ওরিয়েন্টালিষ্ট তৈরি)।
এই পর্যায় কালটি সবথেকে ভয়ঙ্কর! কেননা এই সময়েই তারা বিশ্বের কেন্দ্রিয় দৃষ্টি ইসলাম থেকে ভিন্ন দিকে তথা পাশ্চাত্যের দিকে ঘুরিয়ে দেয়, যুগসমূহকে ভাগ করার পাশাপাশি তারা নিজেদের জন্য নিজস্ব বয়ান তৈরি করে।
অর্থাৎ ইসলামী সভ্যতায় সবকিছুই ছিল ফিকহ কেন্দ্রিক। যেমন সমাজ, আইন, অর্থনীতি, রাষ্ট্র এসব ফিকহ কেন্দ্রিক ছিল। ফিকহ ছিল ইসলামী সভ্যতার মূলনীতি ও আখলাক।

পাশ্চাত্য এই মূলনীতি ও আখলাকের বয়ান হাজির করে তাদের তৈরিকৃত সমাজবিজ্ঞান দিয়ে। বর্তমান বিশ্বের সমাজ, আইন, অর্থনীতি, রাষ্ট্র সবই এই সমাজবিজ্ঞান’কে কেন্দ্র করে। এই সমাজবিজ্ঞান-ই হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতার আখলাক। এই সমাজ বিজ্ঞান-ই আমরা পৃথিবীর সকল শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ করি। আর এই বয়ান হাজির হয় মূলত ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে, তাই বিপ্লব পরবর্তী কয়েকটি অবস্থার ইতিহাস যদি আমরা দেখি, যেমন_
• আমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ, অন্যরা সবাই দাস!
যার ফলশ্রুতিতে তারা কলোনি স্থাপন করত, শোষণ করত, দাস বানাত কিন্তু ধর্মান্তরিত করত না। কারণ ধর্ম গ্রহণ করলে তো তারা আমাদের সমপর্যায়ে চলে আসবে, সমান অধিকার দিতে হবে।
এক্ষেত্রে শুধু একটি দুঃখজনক বিষয় লক্ষ্য করুন ইসলামী সভ্যতায়, যেমন সিরিয়াতে, মিশরের সব জায়গায় খ্রিস্টান ছিল, দিল্লিতে হিন্দুরা ছিল। কিন্তু মুসলিমরা তাদেরকে ভাই হিসেবে সমস্ত অধিকার দিত, একত্রে বসবাস করত। উল্টো তারা মুসলমানদের ধর্ম পালন দেখে নিজেদের ধর্মকে ভালোভাবে পালন করত, এবং ধর্মকে শক্তিশালী করে জীবন্ত করে তোলে, কিন্তু কোন বাধা ছিলনা কারণ ইসলামের শরীয়তের পূর্ণ বাস্তবায়ন ছিল। কিন্তু আজ আমরা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সহ্য করতে পারিনা কেন? কারণ আমরা পাশ্চাত্যের সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বেড়ে ওঠা মুসলিম! চিন্তায় উম্মাহ কেন্দ্রিক নই বরং প্রচন্ড মাত্রায় চিন্তাগত সাম্প্রদায়িক!
(আমাদের সভ্যতার ধারায় ভাষা ও বর্ণের পার্থক্যকে, মাজহাব ও চিন্তার ভিন্নতাকে প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক একটি বিষয় বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে অপরদিকে পাশ্চাত্য মানুষ ও এই সকল ভিন্নতাকে অন্যরা বলে, ভিন্নকিছু বলে অভিহিত করে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে থাকে।।
আজ মুসলিম উম্মাহর মধ্যেও যে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা এটা মূলত এই পাশ্চাত্য চিন্তারই একটি ফসলমাত্র।)

• রাষ্ট্রের জন্যই মানুষ! তাই রাষ্ট্রের স্বার্থে মানুষকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করা যাবে। ইসলামে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব, খেলাফত, ইনসানিয়াত সবকিছুর বিপরীতেই আজ গোটা বিশ্বব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে বর্তমান শ্রমনীতি মহা জুলুমপূর্ণ! মালিকপক্ষ কোটি কোটি টাকা শুষে নিচ্ছে, শ্রমিকেরা (তাদের ভাষায় দাস) মাত্র কয়েক হাজার টাকার জন্য, দুবেলা খাবারের জন্য রাতদিন খেটে মরছে!
• মানুষকে দাস বাড়ানোর সাথে সাথে সেই গ্রীক, ফেরাঊনী রাষ্ট্রনীতির মোড়কে নতুন রাজনীতি ও অর্থনীতির উত্থান হয়। সেই ফেরাউনি সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিই আজ বিশ্বের প্রধান পরিচালন পদ্ধতি।
• এবং তাঁরা গর্ব করে গ্রন্থ লিখে এই end of the history বা ইতিহাসের শেষ, অর্থাৎ তারাই স্থায়ীভাবে দুনিয়ার ক্ষমতায় আসীন হলো!
যাইহোক এর মধ্য দিয়ে দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ জুলুমের মধ্যে পতিত হলো! ৬০% মানুষ অনাহারে, ৭০% বিনা চিকিৎসায় এবং অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করতে শুরু করল! পৃথিবীব্যাপী শুরু হয় ধরে ধরে দাস বানানোর, দুর্ভিক্ষ ও হত্যাযজ্ঞের, মহা জুলুমের ওপনিবেশিক শাসন! এসবের মধ্য দিয়েই পাশ্চাত্য সভ্যতা ফুলে-ফেঁপে দৃষ্টিনন্দন ইউরোপ গড়ে তুলতে শুরু করে!
এইসময়েই নারী, কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর উপর ভয়াবহ জুলুমের বিপরীতে মুক্তির আওয়াজ উঠতে থাকে। এবং উত্থান পর্যায়ের ৩য় ধাপ পাশ্চাত্যের ক্ষমতায়ন।

ইউরোপের ক্ষমতা পরবর্তী সময়ে মানুষের ভয়াবহ অবস্থা দেখে, ইউরোপের শ্রমিক ও অনান্য সাধারণ জনগণের অবস্থা দেখে স্বয়ং ইউরোপীয়ানরাই শংকিত হয়ে উঠে।
শিল্পবিপ্লবের পরে ইউরোপীয়ানদের রক্ষা করা জন্য ইউরোপেই বিভিন্ন আন্দোলন গড়ে ওঠে,
♦ জার্মান রোমান্টিসিজম।
তাদের মূল কথা ছিল ধর্মের পুনর্জাগরণ ছাড়া মানবতার মুক্তি অসম্ভব। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে সামগ্রিকভাবে একটি ধর্ম হিসেবে খ্রিস্টান ধর্মের সেই অবস্থা ছিলনা, ব্যবস্থাগত ভিত্তি তো আরোও ছিলনা!
♦ এরপর শুরু হয় জার্মান জাতীয়তাবাদী আন্দোলন।
যা এখনও বিদ্যমান রয়েছে, তাদের কথা একমাত্র জার্মানরাই পারে গোটা মানবতার মুক্তি দিতে। কিন্তু একটি কট্টর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিশ্বজনীন সংকটকে মোকাবেলা করে দুনিয়াব্যাপী ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা! এটি একটি অলীক কল্পনা ব্যাতীত ভিন্নকিছু হতে পারেনা!
♦ এরপরে উঠে আসে জায়নবাদী জার্মান নাগরিক কাল মার্ক্স।
কাল মার্ক্স পুঁজিবাদকে খণ্ডন করেন এবং বলেন, পুঁজিবাদ সব বিক্রি করতে করতে শেষপর্যন্ত নিজের ছায়াকে যদি বিক্রি না করতে পারে তাহলে নিজের শরীরকে কেটে ফেলবে!
তবে তার দেখানো দুইশ্রেণী (শ্রমিক ও বুর্জোয়া) ইউরোপের প্রেক্ষাপটে ঠিক হলেও তা বিশ্বজনীন হতে পারেনি, অধিকাংশ অঞ্চলে সাথেই তা সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। এবং তার সমস্ত কিছুর মূল ফোকাস হচ্ছে অর্থনীতি, কিন্তু বাস্তবতা হলো সকল সঙ্কট, উত্থান-পতন অর্থনীতি কেন্দ্রিক নয়!
তবে বহু ভালো মূলনীতি থাকায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো করলেও তাদের দ্বারা মানবতার মুক্তি সম্ভব হয়নি, পাশ্চাত্যের ন্যায় একইভাবে জুলুমের শিকার হয়েছে বহু অঞ্চলের মানুষ! সর্বোপরি তারাও পুঁজিবাদের নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তথা ব্যক্তির শোষনস্থলে সমাজতন্ত্রের নামদিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে শোষন শুরু করে!

আচ্ছা এখন প্রশ্ন হল, এর কোনটাই মানবতার মুক্তি দিতে সক্ষম নয়। এইদিকে হিন্দুত্ববাদ অধিকাংশই সংস্কৃতি কেন্দ্রিক, যার গোড়াতেও সেই ব্রিটিশরাই, তারা কি আদৌ পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য হুমকি? বা চায়না সভ্যতা তো পাশ্চাত্যের আদলে গড়ে উঠা জারজ সন্তানের ন্যায়, তাহলে তাদের দাড়াই বা কিভাবে মুক্তি সম্ভব?
এক কথায় জবাব, এসবে যে মুক্তি অসম্ভব তা প্রকৃতিই বলে দিয়েছে।

এখন কথা হল এই পাশ্চাত্য সভ্যতা ক্ষমতায় মাত্র আড়াইশো বছর হল। কিন্তু যারা প্রায় বারশো বছর প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে ন্যায়ভিত্তিক সভ্যতা পরিচালনা করল তারা কি এখন নেই?
সেই ‘ফিকহ’ কি হারিয়ে গিয়েছে ? সকল কিছুর উৎস ‘আল-কোরআন’ কি তাদের হাতে নেই?
তাহলে তাদের মধ্য থেকে কি মুক্তি আন্দোলন গড়ে ওঠেনি?
_

ইসলামী সভ্যতার(সাময়িক) পতন ও পাশ্চাত্য সভ্যতার উত্থানের মধ্য দিয়ে ভয়াবহ সংকট যখন সামনে এসে উপস্থিত হয়, তখন নিজেদের অযোগ্যতা, রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও জ্ঞানের মৃত্যুবরণের কারণে গোটা মুসলিম উম্মাহ কঠিন চেলেঞ্জের সম্মুখীন হয়।
সেই সময়েই গড়ে ওঠে বিশ্বজনীন মুক্তির আন্দোলন তথা ইসলামী আন্দোলন।
আব্দুল হামিদ খানের খিলাফত আন্দোলন, আল্লামা ইকবালের আহ্বান “Political activities is the expression of spirituality” বিশ্বব্যাপী এক জাগরণের সৃষ্টি করে।
ইমাম হাসানুল বান্না, মাওলানা মওদূদী, নাজমুদ্দিন এরবাকানরা শক্তিশালী যৌক্তিকতার ভিত্তিতে তুলে ধরেন “বিশ্বমানতার মুক্তির একমাত্র সমাধান ইসলাম” এবং গোটা মানবতার উদ্দেশ্যে বলে উঠেন_”আমাদের রাজনীতি অভুক্তদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার রাজনীতি, আমাদের রাজনীতি অধিকার হারাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি।
আমরা কেবলমাত্র মুসলমানদের মুক্তির জন্য কাজ করি না। আমরা সেই সকল‌ অ্যামেরিকানদের জন্যও কাজ করি যারা ব্রিজের নীচে রাস্তার ধারে জীবন যাপন করে। আমরা সেই ইউরোপের সেই সকল বোনদের জন্যও কাজ করি যারা বাধ্য হয়ে পতিতার মত ঘৃণ্য পেশাকে বেছে নিয়েছে। কারণ ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, ইসলাম সমগ্র বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য।”

এরই মধ্য দিয়ে পৃথিবী নতুন নতুন পথ পাড়ি দিতে শুরু করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হল, এরপরে রুশ বিপ্লব, ডিক্টেটরশিপ এবং পুঁজিবাদের আরো বেশি ভয়াবহ উত্থান শুরু হয়।
চলমান পরিস্থিতির মধ্যদিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়, এরপরেই পৃথিবী নতুন করে ডিজাইন করে পাশ্চাত্যের মোড়লেরা! নতুনভাবে ডিজাইনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে,
~ ব্রেটনউড চুক্তি, ইয়াল্টা কনফারেন্স ( Stalin – Churchill – Roosevelt)।
~ জাতিসংঘ ও সহযোগী সংগঠন সমূহের প্রতিষ্ঠা।
ইসরাইল প্রতিষ্ঠা, ন্যাটো, প্রতিষ্ঠা।
~ স্নায়ু যুদ্ধ, ন্যাটোর লক্ষ্যে পরিবর্তন (ন্যাটোর রঙ লাল থেকে সবুজ হয়ে যায়)।
~ পেন্টাগণ ও টুইন টাওয়ারে আক্রমন (নাইন ইলেভেন)।

এসবের মধ্যদিয়েই গোটা বিশ্বের সমস্ত ব্যবস্থা-ই পাশ্চাত্য কেন্দ্রিক হয়ে যায়! আর এভাবেই চলছে আজকের দুনিয়া।

যাই হোক
বিশ্বব্যাপী মুক্তি আন্দোলন দেখাতে শুরু করে মুসলিম উম্মার বিশাল সম্ভাবনা গুলিকে, এবং বুঝিয়ে দেয় একমাত্র আমাদের দ্বারাই আবারো সেই সভ্যতার বিনির্মাণ করা সম্ভব। কেননা,
• ইসলামের উন্নত মূল্যবোধ ও অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক শক্তি, এর গতিশীল ইতিহাস(স্বর্ণালী শ্রেষ্ঠ সভ্যতার ইতিহাস) এবং কৌশলগত অবস্থান সবচেয়ে শক্তিশালী।
• মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল অঞ্চল আমাদের।
• সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক শক্তি এবং কৌশলগত খনিজ সম্পদ ৯০ভাগই আমাদের।
• পৃথিবীর ৭০ – ৭৫ ভাগ প্রাকৃতিক সম্পদ মুসলিম ভূখন্ডের ভেতরেই।
• ২০০ কোটি মুসলমান।
– সবচেয়ে যুবকের সংখ্যা মুসলমানদের মধ্যে।
– মধ্য এশিয়াতে বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা।
– চায়না, রাশিয়া এবং ভারতে বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা।
– পাশ্চাত্যে মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইত্যাদি সম্ভাবনাগুলোকে সামনে রেখেই নিয়ে আসে মানবতার মুক্তির এক ঐতিহাসিক মূলনীতি। তা হচ্ছে,
ﺍﻹﺳﻼﻡ ﺩﻋﻮﺍﺗﻨﺎ. ﺍﻟﻠﻪ ﻏﺎﻳﺘﻨﺎ. ﺍﻟﻨﻈﺎﻡ ﺍﻟﻌﺪﻝ ﻫﺪﻓﻨﺎ. ﺳﻌﺎﺩﺓ ﻛﻞ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﻃﻠﺒﻨﺎ. ﺍﻹﻗﻨﺎﻉ ﻣﻨﻬﺠﻨﺎ. ﺍﻟﺠﻬﺎﺩ ﻃﺮﻳﻘﻨﺎ.
~ আমাদের দাওয়াত ‘ইসলাম’।
~ আমাদের লক্ষ্য_ আল্লাহর সন্তুষ্টি।
~ আমাদের ভিশন_ ন্যায় ভিত্তিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
~ আমাদের কামনা_ গোটা মানবতার কল্যাণ।
~ আমাদের মানহাজ/পদ্ধতি_ সম্মতি করানো, বোঝানো।
~ আমাদের রাস্তা_ জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ।

এরপরেই চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে আল্লামা ইকবালের সেই রাজনীতির আহ্বানের সাথে সাথে যুগের আলোকে নাজমুদ্দিন এরবাকান এটাও বুঝিয়ে দিলেন ” Economic activities is the expression of Islam’s spirituality”.
এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেলেন উত্তম মিরাস, তা হচ্ছে ইসলামী ইউনিয়ন তথা D-8 মডেল।
_

এপর্যায়ে এসে শুধুমাত্র নাইন ইলেভেনের একটি বিষয় চিন্তা করুন, পাশ্চাত্যের যেসকল দার্শনিকরা কখনোই ধর্মীয় কথা বলত না। যেমন Jurgen Habermas, তিনি বললেন এই আক্রমণ ধর্মীয় আক্রমণ! ধর্ম দিয়েই এর মোকাবেলা করতে হবে! আচ্ছা বুশের ধর্মীয় ক্রুসেড ঘোষণার পরে নির্দিষ্ট সময়ে এসেই তিনি কেন একথা বললেন?
তারমানে কি একথাই স্পষ্ট নয় যে, সকল মুক্তি আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও পাশ্চাত্যের বিশ্বব্যাপী জুলুমের শাসনের বিপরীতে একমাত্র সমাধান হচ্ছে ইসলাম, ইসলামী সভ্যতার পুনর্জাগরণ। আর এটি অন্যকেউ না বুঝলেও পাশ্চাত্য খুব ভালোভাবেই বুঝে!

এজন্য মহান পূর্বপুরুষদের দেখানো সমাধানের পথেই আমাদের হাঁটতে হবে । সমাধানগুলি হচ্ছে,

১. সর্বাগ্রে আখলাক এবং আধ্যাত্মিকতার প্রাধান্য দিয়েই এই পথ পাড়ি দিতে হবে। ইসলামের মূলনীতির সাথে কারো আপোষ করা যাবেনা।
২. আমরা বিশ্বাস করব, সমস্ত মুসলিম দেশগুলিতে সরকার এবং সমাজ উভয়েই একই সুঁতোয় মিলিত হয়ে জনগণের সেবা করবে। সেই সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৩. আমরা বিশ্বাস করি যে মুসলিম উম্মাহ শক্তিশালী হতে হলে, নিজেদের উপর শোষণ ও বিদেশী উৎসের উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করার জন্য উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে “শিল্পায়ন” করতে হবে।
আমাদের জ্ঞান, প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে শুরু করে ঔষধ শিল্প, খনন, কৃষিকাজ, অর্থ ও পরিবহন ব্যবস্থা এক মুসলিম দেশ অন্যগুলির মধ্যে সহযোগিতার সর্বোচ্চ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইসলামিক কমন মার্কেট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৪. আমরা এও বিশ্বাস করি যে আমেরিকান ডলারের পরিবর্তে (যা আমাদেরকে বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদের দাসত্ব করতে বাধ্য করে) আমাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কর‍তে হবে।

৫. আমাদের দেশ ও জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করার জন্য “আন্তঃমুসলিম দেশীয় সাংস্কৃতিক সহযোগিতার” বিকাশ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তুলতে হবে।
আমরা “পুঁজিবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার” মূল্যবোধগুলি চাইনা, তবুও তা আরও বর্বর হয়ে উঠছে! যার কোনও মানবিক এবং নৈতিক মূল্যবোধ নেই! তাই আমাদেরকে আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ এবং সভ্যতায় ফিরে আসতে হবে, যা আমাদেরকে অতীতে উন্নত করে তুলেছিল এবং ইহাই আমাদের সভ্যতাকে আবারো সেই দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

৬. আমরা আগ্রাসনে বিশ্বাস করি না তবে আমাদের বিরুদ্ধে যে কোনও আক্রমণাত্মক হামলার প্রতিরোধ করতে আমাদের অবশ্যই একটি “মুসলিম দেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি” দরকার যা হবে আগামীর মুসলিম ন্যাটো।
এই আদর্শগুলি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাস থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আমাদের কাঁধে অর্পিত হয়েছে। এগুলি সাধারণ আদর্শ কিংবা মতামত নয় যা সহজেই খারিজ হয়ে যাবে!

এখন প্রশ্ন আসতে পারে এমন লোকবল, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামী সংগঠন কোথায় পাবো? সেটা গড়ে উঠা কি করে সম্ভব?
তাদের জন্য কথা হচ্ছে_
হিটলার, কার্ল মার্কস, গান্ধীর উপরে ‘ঈমান‘ এনে মানুষ যদি হাজারো অসাধ্য সাধন করতে পারে, তাহলে আল্লাহর উপর ঈমান এনে কি কিছুই করতে পারবেনা?
স্বদেশের মাটির প্রতি যদি মানুষের এতবেশী আকর্ষন থেকে থাকে যে তার জন্য মানুষ জানমালের ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের প্রতি কি এতটুকু ও আকর্ষন সৃষ্টি হতে পারেনা?
বরং সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার সন্তান হিসেবে, দ্বীনে মুবিন ইসলামের খলিফা হিসেবে মানবতার মুক্তি আন্দোলনের মুজাহিদ দল উঠে আসা কি সবচেয়ে যৌক্তিক বিষয় নয়?
কাজেই ভীরু, কাপুরুষ ও দুর্বলচেতা লোকদের মতো একথা বলার কোনোই সুযোগ নেই যে, এবিশাল মুক্তি আন্দোলনে যে সকল সংগ্রামী মানুষদের প্রয়োজন, তা কোথাও পাওয়া যাচ্ছেনা!!

এজন্য প্রতিটি অঞ্চলের, দেশের সংগঠন ভিত্তিক সবাইকে শক্তিশালী হয়ে উঠতেই হবে। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, শ্রমনীতি, নারী, কৃষি এসব কোন সমস্যাই নির্দিষ্ট অঞ্চলের নয়! এসব-ই বিশ্বজনীন সংকট, সুতরাং সমাধান হতে হবে বিশ্বজনীন।
আর আমাদের কাছে তো সেই কুর’আন বিদ্যমান।
সভ্যতার প্রাণসত্তা ‘ফিকহ’ বিদ্যমান। বিশ্বজনীন মুক্তির কাফেলাও আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তবুও কেন আমাদের হীনমন্যতা..?

সর্বশেষ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ভাষায়,
ﻣَﻜَﺮُﻭﺍْ ﻣَﻜْﺮَﻫُﻢْ ﻭَﻋِﻨﺪَ ﺍﻟﻠّﻪِ ﻣَﻜْﺮُﻫُﻢْ ﻭَﺇِﻥ ﻛَﺎﻥَ ﻣَﻜْﺮُﻫُﻢْ ﻟِﺘَﺰُﻭﻝَ ﻣِﻨْﻪُ ﺍﻟْﺠِﺒَﺎﻝُ
‘তারা তাদের সব রকমের চক্রান্ত করে নিয়েছে
কিন্তু তাদের প্রত্যেকটি চক্রান্তের জবাব আল্লাহর
কাছে রক্ষিত আছে। যদিও তাদের চক্রান্তগুলো পাহাড় টলিয়ে দেয়ার মত হবেনা।’

Written By Hasan Al Firdaus

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here