রমজান এমন এক আধ্যাত্মিক সময়কাল, যে সময়টিতে গোটা মুসলিম উম্মাহর অন্তরে রুহানি বাতাস বইতে থাকে। জান্নাতি এক অনুভূতি মুসলিম অন্তরে প্রবাহিত হতে থাকে, যা শুধুই অনুভবের। তাই সকল বাহ্যিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিটি রুহানি অন্তরই শুধু পারে আরেকটি অন্তরের কাছে ‘পুনর্জাগরণের’ অনুভূতিকে পৌঁছে দিতে। সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার পূর্বপুরুষগণ আমাদের সে শিক্ষাই দিয়ে গিয়েছেন।
আর আমরা যদি সেই শিক্ষার ইতিহাসকে পর্যালোচনা করি তাহলে সুস্পষ্টই দেখতে পাই,

• রমজান হল ‘انشاء الأخلاق’ এর মাসঃ
মুসলিম উম্মাহর পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ‘আখলাকী পতন’। রাষ্ট্রীয় আখলাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত আখলাক পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই এসংকট ফুটে উঠেছে! রমজান বিশ্বজনীন এই সংকট মোকাবেলার শিক্ষাই আমাদের দিয়ে যায়।

• রমজান হল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরীর মাসঃ
বিশ্ব অর্থনীতির সংকটকালে মুসলিম উম্মাহর স্মরণ করা উচিত সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হল, জ্ঞান ও বাণিজ্য। কেননা এই রমজানেই মহান রব কুর’আন নাযিল করে আমাদের সাবধান করেছিলেন,
ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻛَﻔَﺮُﻭﺍ ﺑَﻌْﻀُﻬُﻢْ ﺃَﻭْﻟِﻴَﺎﺀُ ﺑَﻌْﺾٍ ۚ ﺇِﻟَّﺎ ﺗَﻔْﻌَﻠُﻮﻩُ ﺗَﻜُﻦ ﻓِﺘْﻨَﺔٌ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻭَﻓَﺴَﺎﺩٌ ﻛَﺒِﻴﺮ
যারা সত্য অস্বীকার করেছে তারা পরষ্পরের সাহায্য সহযোগীতা করে৷ যদি তোমরা এটা না করো তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা সৃষ্টি হবে ও বড় বিপর্যয় দেখা দেবে৷(আনফাল ৭৩)
এই আয়াতটা স্পষ্টই দিকনির্দেশনা দিচ্ছে কোন কোন ব্যাপারে আমাদের পারস্পারিক সাহায্য করা আবশ্যক, সেগুলি হলো-
১, জ্ঞানের ক্ষেত্রে সহযোগিতা।
২, অর্থনৈতিক সহযোগিতা। ইত্যাদি
অথচ মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এদুটি বিষয়েই প্রচণ্ড ঘাটতি..!
তাই রমজানকে কেন্দ্র করে সকল বিভেদ ভুলে গিয়ে গড়ে উঠতে পারে ‘ইসলামিক ইউনিয়ন’ বাস্তবায়নের নতুন দুয়ার। রমজানে সকল হৃদয় সেই সম্পর্কের জন্য আধ্যাত্মিক ছোঁয়া ও রুহানি পরশ পেতে থাকে; প্রয়োজন শুধু আমাদের প্রচেষ্টার।

• রমজান জ্ঞানের পুনর্জাগরণের মাসঃ
احياء العلوم , تجديد الفكر , الإصلاح في المنهج
(জ্ঞানের পুনর্জাগরণ, চিন্তার আধুনিকায়ন, পন্থার সংশোধন) এই তিনটি ব্যতীত নতুন সভ্যতার বিনির্মাণ অসম্ভব। তাই রমজান প্রত্যেকটি বিষয়কে আলাদা আলাদা ভাবে গড়ে তোলার শিক্ষা দেয়। যেমন- রমজান আমাদের আধ্যাত্মিক শক্তি দিচ্ছে, কিন্তু জ্ঞানের মৃত্যুবরণের কারনে সেটিও আমরা উপলব্ধি করতে পারছিনা! সুতরাং ভয়াবহ এই ঘাটতিগুলো পূরণের সুস্পষ্ট হিকমাহ-ই তুলে ধরছে রমজান। প্রফেসর ড মেহমেদ গরমেজের ভাষায়, ইসলামী সভ্যতার বিজয়ের প্রধান শর্ত ‘জ্ঞানের পুনর্জাগরণ’।

• রমজান আকলের সত্যিকার ব্যবহার ও গুরুত্বারোপের মাসঃ
ওহী এবং আকলের সমন্বয় ঘটিয়ে ইমাম মাতুরিদীর মতো আলেম, ইমাম গাজ্জালীর মত মুতাকাল্লিম, মিমার সিনানের মত বিজ্ঞানী গড়ে তোলার উদ্যোগ ও শপথ নেওয়ার মাস এই রমজান।

• রমজান ক্বলবকে পরিচ্ছন্ন করার ও তাকওয়া অর্জনের মাসঃ
মহান প্রভুর সাথে একান্ত আলাপন, জিকির, তিলাওয়াত, নফল ইবাদতের মধ্য দিয়ে ক্বলব পরিছন্ন করার মহান সময় ‘রমজান’। তাকওয়ার কথা বলে গিয়ে আল্লাহ বলেন,
ﻭَﻟَﻮْ ﺃَﻥَّ ﺃَﻫْﻞَ ﺍﻟْﻘُﺮَﻯ ﺁﻣَﻨُﻮﺍْ ﻭَﺍﺗَّﻘَﻮﺍْ ﻟَﻔَﺘَﺤْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢ
ﺑَﺮَﻛَﺎﺕٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽِ
আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান
আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে
আমি তাদের প্রতি আসমান ও যমিনের সমস্ত বরকত সমূহের দরজা খোলে দিবো। (সুরা আরাফ ৯৬)

• রমজান জিহাদ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলার মাসঃ
জুলুম উৎখাতের আন্দোলন, আদালত প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং দ্বীনের জন্য না খেয়ে থেকে জীবন দান করার ‘বদর যুদ্ধ’ এমাসেই হয়েছে, ইখতিয়ারউদ্দিনের বঙ্গবিজয়ও এমাসেই। তাই রমজানকে কেন্দ্রকরে সকল যুবকদের চিন্তারাজ্যে উপলব্ধি হওয়া উচিৎ যে, প্রতিটি যুদ্ধ- সংগ্রাম হচ্ছে হক্ব প্রতিষ্ঠার, জুলুমের প্রতিবাদী আন্দোলনের নাম। আর সকল আন্দোলন, মুক্তির জন্য প্রধান শর্ত যোগ্য নেতৃত্ব। ইসলামী সভ্যতার পতন ও বর্তমান মুসলিমদের সবচেয়ে বড় সংকটও এই যোগ্য নেতৃত্ব! সুতরাং রমজান থেকেই সুলতান ফাতিহ, জহির উদ্দিন বাবর গড়ে তুলার প্রতিজ্ঞা গ্রহন করতে হবে।

• রমজান আল্লাহর দেওয়া আল-কোরআনের মাসঃ
ﺷَﻬْﺮُ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥَ ﺍﻟَّﺬِﻱَ ﺃُﻧﺰِﻝَ ﻓِﻴﻪِ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁﻥُ ﻫُﺪًﻯ ﻟِّﻠﻨَّﺎﺱِ
ﻭَﺑَﻴِّﻨَﺎﺕٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﻬُﺪَﻯ ﻭَﺍﻟْﻔُﺮْﻗَﺎﻥِ ﻓَﻤَﻦ ﺷَﻬِﺪَ ﻣِﻨﻜُﻢُ ﺍﻟﺸَّﻬْﺮَ
ﻓَﻠْﻴَﺼُﻤْﻪ
রমজান মাসই হল সেই মাস, যেমাসে মানবজাতির পথপ্রদর্শক, পথ প্রদর্শনের উজ্জল নিদর্শনসমূহ এবনহ ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারীকোরআন নাযিল করা হয়েছে। অতএব যে এইমাস পেল, যে যেন অবশ্যই রোজা রাখে। (সুরা বাকারা ১৮৫)
তাই কোরঅানকে কেন্দ্র করেই আমরা আবার ঐক্যবদ্ধ হব, মানবতার মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যাব।

• রমজান সামাজিক সৌহার্দের মাসঃ
ইসলামী সভ্যতা রমজানকে কেন্দ্র করে যুব বান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ করত, উৎসবের আয়োজন করত। যা গোটা সমাজের সকলকেই একত্রিত করে একটি রুহানি প্লাটফর্ম দিত এবং এর সাথে থাকতো ইসলামের প্রাণসত্তা, সুদূরপ্রসারি চিন্তা, উম্মাহ কেন্দ্রিক চেতনা। রমজান কে কেন্দ্র করে যে পরিবেশ সৃষ্টি হতো, রাষ্ট্রীয় উদ্দীপনা শুরু হতো, তাতে সবাই_ স্বজন হারানো গরিবদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেতো, নিজে গোপনে উপকার করা ও অনান্য যুবক, শিশুদের উৎসাহ প্রদান করা, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আনন্দ বঞ্চিত সব বন্ধুদের জন্য দোয়া করা, মুজাহিদদের জন্য দোয়া করা, সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করা।
প্রতিবেশী, গরীবদের পাশে থাকা তো মুসলমানদের ঈমানের অংশ হিসেবেই গণ্য হত। পাঞ্জাবী, জুব্বা, লুঙ্গি পড়ে সবাই মিলে তারবীহ তে যাওয়া। নকশি টুপি পড়া, গায়ে আতর মাখা, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করে সবাইকে নিয়ে ইফতার করা আর এই অংশগ্রহণের মাঝে অন্যান্য ধর্মের সকলকে নিয়েই একাকার হয়ে যেত মুসলিম উম্মাহ।
রমজান এশিক্ষা নিয়ে আবারো হাজির হয়েছে..

• রমজান পারস্পারিক সম্পর্ক ও শিশুকিশোরদের উজ্জিবিত করার মাসঃ
চারদিক ইফতারের ঘ্রাণ ভেসে আসতে থাকে, সবাইকে দাওয়াত দেওয়া, দাওয়াত খাওয়ার মধ্যদিয়ে গড়ে উঠে অন্যরকম সম্প্রতি। আর তাকে কেন্দ্র করে নানা ক্যালিগ্রাফি, আর্টশিল্প দিয়ে ভরে উঠুক প্রতিটি রাস্তা, বাড়ির দেয়াল। বাচ্চাদেরকে নিয়ে এসব সাজানো, নানাবিধ গান, তাকবীর, জিকিরে ভরে উঠুক চারপাশ।

• রমজান হচ্ছে বিশ্ববাসীকে মুক্তির সংস্কৃতি, সামাজিক আন্দোলনের নাম।

রজমান এক বিশ্বজনীন উৎসবের নাম। রমজান আধ্যাত্মিক বলয় সৃষ্টিকারী প্রশান্তির নাম। রমজান গোটা উম্মাহকে রুহানি বন্ধনে আবদ্ধকারী মহান অনুভূতির নাম। রমজান বিশ্ব মানবতার মুক্তির শপথ নেওয়ার নাম।
হ্রদমাজারে আজ এক রুহানি বাতাস বইতে শুরু করেছে, সেই শীতলা বাতাসের উপলব্ধি থেকেই প্রখ্যাত কবি সেজাই কারাকোচের ভাষায় বলতে চাই, “মুসলিম উম্মাহ যদি এখনো জীবিত থাকে, মূলত রমজানের কারণেই জীবিত আছে। আর একদিন যদি পরিপূর্ণভাবে জেগে উঠে তাহলে রমজানের মাধ্যমে জেগে উঠবে। আর সেই জাগরণ শুরুও হবে রমজানের মাধ্যমেই।”

“আহলান সাহলান
মাহে রমজান”

Writer: Hasan Al Firdaus

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here